দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মানিতে তা-ই হয়েছিল। সেই সময়ে বেতারযন্ত্র খুব জনপ্রিয় ছিল। হিটলারের মন্ত্রী গোয়েবলস বিনা মূল্যে জার্মান নাগরিকদের একটি করে রেডিও দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। গোয়েবলস প্রচার করতেন, জার্মানিতে হিটলারের মতো শক্তিশালী একজনকে দরকার। তিনিই পারবেন জার্মান জাতিকে তার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে। বেতারে এ প্রচারণা শুনতে শুনতে মানুষ বিশ্বাসও করত। গোয়েবলসের শেষ পরিণতি ছিল করুণ। তিনি বিষপান করে সপরিবারে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
একালের গোয়েবলসরা যখন একতরফা অপপ্রচারে লিপ্ত, তখন সত্যিকারের অবস্থাটা কী সেদিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক। ২০০৯ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার যেসব কাজ করতে পেরেছে, তা অতুলনীয়। বড় সমালোচকও বলবে, নিকট-অতীতে এমন উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ তাদের চোখে পড়েনি। সাধারণ মানুষ জানে, গত ১৪ বছরে দেশ উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হয়েছে। দেশ আজ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। চলতি বছর চার কোটি চার লাখ মেট্রিক টন চালসহ চার কোটি ৭২ লাখ মেট্রিক টন দানাদার শস্য উৎপাদন হয়েছে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, সবজি, ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দারিদ্র্যের হার ৪০ থেকে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। মাথাপিছু আয় ৫৪৩ ডলার থেকে দুই হাজার ৮২৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। সাক্ষরতার হার ৪৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭৫.২ শতাংশ। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ধারাবাহিকভাবে সরকার পরিচালনায় আছে বলেই এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে। পদ্মা সেতুসহ বহু মেগাপ্রজেক্ট বাস্তবায়িত হয়েছে এবং আরো হচ্ছে।
২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত, স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় শেখ হাসিনার সরকার। এ জন্য প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন শুরু করা হয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা কী? পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১ তৈরি করেছে। এটা হচ্ছে উন্নত দেশে যেতে রূপকল্প-২০৪১-এর রোডম্যাপ বা পথচিত্র। ২০৪১ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অনেক সংস্কার কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হবে। ওই সময়ে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৯.৯ শতাংশ। মানুষের গড় মাথাপিছু আয় গিয়ে ঠেকবে সাড়ে ১২ হাজার ডলারে। চরম দারিদ্র্য বলতে কিছু থাকবে না। তা শূন্যে নেমে আসবে। মাঝারি দারিদ্র্যও কমে আসবে ৫ শতাংশের নিচে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ওই সময়ে বেসরকারি খাত ও বাজারব্যবস্থা অধিকতর উৎপাদনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হবে। কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য পরিচর্যা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস ও থ্রিডি মেটাল প্রিন্টিং প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এতে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান বাড়বে।
অপপ্রচারে দেশের একালের গোয়েবলসরা যতটা শক্তিশালী, সরকার বা সরকারি দলের তৎপরতা সেভাবে লক্ষণীয় নয়। দলের একনিষ্ঠ সমর্থকও স্বীকার করবেন, সরকারের অর্জনগুলো নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রচার তুলনামূলক কম। ইউটিউব, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে গোয়েবলসের প্রেতাত্মারা যেভাবে সক্রিয়, সরকারের উন্নয়ন সেভাবে প্রচার পাচ্ছে না। ফলে নেতিবাচক প্রচারণাই মানুষের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে। গোয়েবলসের প্রেতাত্মারা একের পর এক বিশ্বাসযোগ্যভাবে মিথ্যাচার করতে থাকলে মিথ্যাটাই সত্য বলে বিশ্বাস করবে সবাই। মিথ্যার জাল ছিন্ন করতে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে হবে। প্রসারের স্বার্থে প্রচারে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে আওয়ামী লীগকে।
লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার
habib.alihabib@gmail.com