আজকের দুনিয়া পুরোটাই প্রচারসর্বস্ব। কথায় আছে, ‘প্রচারেই প্রসার’। অন্যদিকে ধারাবাহিক অপপ্রচার সম্প্রচারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। অপপ্রচারের একচ্ছ"/>
Home সম্পাদকীয় আওয়ামী লীগকে প্রচারে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে

আওয়ামী লীগকে প্রচারে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে

আলী হাবিব

by Nahid Himel
আজকের দুনিয়া পুরোটাই প্রচারসর্বস্ব। কথায় আছে, ‘প্রচারেই প্রসার’। অন্যদিকে ধারাবাহিক অপপ্রচার সম্প্রচারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। অপপ্রচারের একচ্ছত্র নায়ক হিসেবে পল জোসেফ গোয়েবলসের নাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে ‘মিথ’ হয়ে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার তৈরি করেন গুজব মন্ত্রণালয়। গোয়েবলস ছিলেন সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। গোয়েবলসের আলোচিত উক্তি ছিল, ‘আপনি যদি একটি মিথ্যা বলেন এবং সেটা বারবার সবার সামনে বলতে থাকেন, তাহলে লোকজন একসময় সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করবে।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মানিতে তা-ই হয়েছিল। সেই সময়ে বেতারযন্ত্র খুব জনপ্রিয় ছিল। হিটলারের মন্ত্রী গোয়েবলস বিনা মূল্যে জার্মান নাগরিকদের একটি করে রেডিও দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। গোয়েবলস প্রচার করতেন, জার্মানিতে হিটলারের মতো শক্তিশালী একজনকে দরকার। তিনিই পারবেন জার্মান জাতিকে তার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে। বেতারে এ প্রচারণা শুনতে শুনতে মানুষ বিশ্বাসও করত। গোয়েবলসের শেষ পরিণতি ছিল করুণ। তিনি বিষপান করে সপরিবারে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন।

১৯৪৫ সালে পল জোসেফ গোয়েবলস পৃথিবীর মায়া কাটালেও তাঁর প্রেতাত্মা এখনো নানা দেশে রাজনীতিবিদদের ওপর ভর করে আছে। বাদ পড়েনি বাংলাদেশও। বাংলাদেশে এমন অনেক রাজনীতিবিদ আছেন, যাঁদের চোখে উন্নয়ন ধরা পড়ে না। দেশের বদলে যাওয়াটা দেখতে পান না তাঁরা। যে চশমাটা চোখে লাগিয়ে পরিপার্শ্ব অবলোকন করেন তাঁরা, সেই চশমায় সব দৃশ্যই ক্লেদময়। সে দৃশ্য বর্ণিল নয়, ফিকে। বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে সক্রিয় নব্য গোয়েবলসরা এখন নানা অপপ্রচারে লিপ্ত। তাঁদের একজন গত শুক্রবার বলেছেন, আগামী দিনে আওয়ামী লীগের নেতাদের কারো নির্বাচন করার অধিকার থাকবে না। তিনি মনে করেন, এখানে ‘কতগুলো অবৈধ লোক জোর করে ক্ষমতা দখল করে বসে আছে’। আরেক গোয়েবলসের মতে, ‘আওয়ামী লীগ বর্গিদের মতো সম্পদ লুট করে এ দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইছে।’ তিনি মনে করেন, ‘এই সরকারকে সরিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে হবে।’ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি। তাঁর দল নাকি মনে করে, ‘বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক খাত কার্যকর সংস্কার সাধনে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আইএমএফ বিশেষ সহযোগিতার হাত বাড়াবে।’ একালের এই গোয়েবলস মনে করেন, ‘আওয়ামী লীগ মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করে দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।’ অথচ তিনি ও তাঁর দলের অনেক নেতা প্রতিদিন এ ধরনের অপ্রপচার করছেন। দেশের স্বাধীন মিডিয়ায় তাঁদের বক্তব্য নিয়মিত প্রচার হচ্ছে। তাহলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ হলো কেমন করে? একালের এই গোয়েবলস আরো মনে করেন, সরকার ‘পতন ছাড়া’ সংকট কাটবে না। তিনি বলেছেন, ‘এই সরকারকে সরে যেতে হবে। এই সরকার সরে গেলেই দেশে ট্রাস্ট সৃষ্টি হবে। তখন এসব সমস্যা সমাধানের জন্য যোগ্য, যাঁরা কাজ করতে পারেন তাঁদের নিয়ে এসে সমস্যা সমাধান অত্যন্ত দ্রুত করা সম্ভব হবে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার সরে যাবে কোন প্রক্রিয়ায়? তিনি যাঁদের যোগ্য মনে করছেন, তাঁরা ক্ষমতায় আসবেন কোন প্রক্রিয়ায়? গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি হচ্ছে নির্বাচন। তাঁর ভাষায়, ‘যোগ্য’রা নির্বাচন করে আসবেন তো? নাকি নির্বাচনবহির্ভূত অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি বেছে নিতে চান এই নব্য গোয়েবলস?

একালের গোয়েবলসরা যখন একতরফা অপপ্রচারে লিপ্ত, তখন সত্যিকারের অবস্থাটা কী সেদিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক। ২০০৯ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার যেসব কাজ করতে পেরেছে, তা অতুলনীয়। বড় সমালোচকও বলবে, নিকট-অতীতে এমন উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ তাদের চোখে পড়েনি। সাধারণ মানুষ জানে, গত ১৪ বছরে দেশ উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হয়েছে। দেশ আজ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। চলতি বছর চার কোটি চার লাখ মেট্রিক টন চালসহ চার কোটি ৭২ লাখ মেট্রিক টন দানাদার শস্য উৎপাদন হয়েছে। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, সবজি, ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দারিদ্র্যের হার ৪০ থেকে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। মাথাপিছু আয় ৫৪৩ ডলার থেকে দুই হাজার ৮২৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। সাক্ষরতার হার ৪৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭৫.২ শতাংশ। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ধারাবাহিকভাবে সরকার পরিচালনায় আছে বলেই এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে। পদ্মা সেতুসহ বহু মেগাপ্রজেক্ট বাস্তবায়িত হয়েছে এবং আরো হচ্ছে।

২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত, স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় শেখ হাসিনার সরকার। এ জন্য প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন শুরু করা হয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা কী? পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১ তৈরি করেছে। এটা হচ্ছে উন্নত দেশে যেতে রূপকল্প-২০৪১-এর রোডম্যাপ বা পথচিত্র। ২০৪১ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অনেক সংস্কার কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হবে। ওই সময়ে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৯.৯ শতাংশ। মানুষের গড় মাথাপিছু আয় গিয়ে ঠেকবে সাড়ে ১২ হাজার ডলারে। চরম দারিদ্র্য বলতে কিছু থাকবে না। তা শূন্যে নেমে আসবে। মাঝারি দারিদ্র্যও কমে আসবে ৫ শতাংশের নিচে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ওই সময়ে বেসরকারি খাত ও বাজারব্যবস্থা অধিকতর উৎপাদনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হবে। কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য পরিচর্যা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস ও থ্রিডি মেটাল প্রিন্টিং প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এতে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান বাড়বে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন রক্ষা পায় এবং উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে, সে জন্য ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ প্রণয়ন করেছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনায় ২০৩০ সালে আমাদের কী অর্জন করতে হবে; ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে করণীয় এবং ২০৫০ সাল পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

অপপ্রচারে দেশের একালের গোয়েবলসরা যতটা শক্তিশালী, সরকার বা সরকারি দলের তৎপরতা সেভাবে লক্ষণীয় নয়। দলের একনিষ্ঠ সমর্থকও স্বীকার করবেন, সরকারের অর্জনগুলো নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রচার তুলনামূলক কম। ইউটিউব, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে গোয়েবলসের প্রেতাত্মারা যেভাবে সক্রিয়, সরকারের উন্নয়ন সেভাবে প্রচার পাচ্ছে না। ফলে নেতিবাচক প্রচারণাই মানুষের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে। গোয়েবলসের প্রেতাত্মারা একের পর এক বিশ্বাসযোগ্যভাবে মিথ্যাচার করতে থাকলে মিথ্যাটাই সত্য বলে বিশ্বাস করবে সবাই। মিথ্যার জাল ছিন্ন করতে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে হবে। প্রসারের স্বার্থে প্রচারে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে আওয়ামী লীগকে।

লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার

habib.alihabib@gmail.com

এই বিভাগের আরো খবর

Leave a Comment